মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক বিবাদজনিত অনিশ্চয়তার ঢেউ লেগেছে ইউরোজোনের অর্থনীতিতে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউরো মুদ্রাভিত্তিক অঞ্চলটি চলতি ও আগামী বছরের জন্য প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে ইউরোপীয় কমিশন (ইসি)। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্কের প্রভাবে ২০ সদস্য দেশ নিয়ে গড়ে ওঠা ইউরোজোনের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি ‘গুরুতরভাবে নিম্নমুখী’ হয়েছে। গত নভেম্বরে চলতি বছরের জন্য ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হলেও তা কমিয়ে দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে।
এছাড়া বসন্তকালীন এ পূর্বাভাসে আগামী বছরের জন্য ইউরোজোনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি কমিয়ে ধরা হয়েছে। নভেম্বরের পূর্বাভাসে ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলেও এখন ১ দশমিক ৪ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে ইকোনমি কমিশনার ভালদিস ডম্ব্রোভস্কিস বলেন, ‘এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আমদানি পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন এবং পরে ৯০ দিনের জন্য তা স্থগিত করেন। এতে এমন এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে যা কভিড-১৯ মহামারীর সবচেয়ে খারাপ সময়ের পর আর দেখা যায়নি।’
তিনি জানান, ইউরোপীয় অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং কর্মসংস্থান বাজারও শক্তিশালী। কমিশনের মতে, আগামী বছর ইউরোজনে বেকারত্বের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসবে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, চলতি বছর ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে জার্মান অর্থনীতির শ্লথগতি। কমিশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি সম্প্রসারিত হবে শূন্য শতাংশ হারে। অর্থাৎ, সংকুচিত না হলেও এ বছর প্রবৃদ্ধির দেখা পাচ্ছে না জার্মানি। ২০২৬ সালে দেশটিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশে।
মূলত সরকারি বিনিয়োগে ঘাটতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে জার্মান অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনে রফতানি হঠাৎ কমে যাওয়ায় ধাক্কা খেয়েছে দেশটির অর্থনীতি। এ বছর পুনরুদ্ধারের আশা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের কারণে জার্মান গাড়ি ও শিল্পপণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সেই আশা ভেস্তে গেছে।
ভালদিস ডম্ব্রোভস্কিস জানান, ইউরোপের অর্থনীতি আরো অবনতির ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব কমানোর চাপে রয়েছেন। কারণ রেটিং সংস্থা মুডি’স সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ‘ট্রিপল এ’ ঋণমান কেড়ে নিয়েছে।
এর আগে রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি এবং ফিচও যুক্তরাষ্ট্রের রেটিং কমিয়েছিল। সংস্থাগুলোর মতে, বাড়তি শুল্ক ও হোয়াইট হাউজের কর কমানোর চাপ এবং আসন্ন শরতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ার পরিকল্পনার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কমার্জব্যাংকের সুদহার বিশ্লেষক হাউকে সিয়েমসেন বলেন, ‘‘যদিও মুডি’স অন্য রেটিং সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে, তবু এ অবনমন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতি কী পরিমাণ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।’’
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের প্রভাব নিয়েই এ সপ্তাহে কানাডায় অনুষ্ঠিতব্য জি৭-এর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরদের বৈঠকে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দেশগুলো এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাবে, তেমন সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বেলজিয়াম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পিয়েরে উইংশ জানিয়েছিলেন, শুল্কের ফলে ইউরোজোন অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপের প্রভাব পড়বে সুদহারে। এতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) সুদহার ২ শতাংশের কিছুটা নিচে নামাতে বাধ্য হতে পারে।
এদিকে গত সোমবার নাগাদ ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশে। জার্মান সরকারের সমমানের বন্ডে সুদহার ২ দশমিক ৬০ ও ইতালির বন্ডে ছিল ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে যাওয়ার পরও ইইউর বন্ডে বিনিয়োগ সেফ হ্যাভেন বা নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা ধরে রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। কারণ সোমবার ইউরোপিয়ান কমিশন তিন বছর মেয়াদি বন্ড বিক্রি করেছে গড়ে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ ইল্ডে। একই দিনে যুক্তরাজ্যের পাঁচ বছরের বন্ডের ইল্ড ছিল ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ।